পশ্চিমবঙ্গের রেল, সড়ক ও জলপথ পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করতে শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি মালদা ও হুগলিতে একাধিক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। মালদায় প্রায় ৩,২৫০ কোটি টাকা এবং হুগলিতে ৮৩০ কোটিরও বেশি টাকা মূল্যের প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের যোগাযোগ পরিকাঠামোতে নতুন গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে চলেছে হাওড়া–গুয়াহাটি (কামাখ্যা) রুটে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন পরিষেবার উদ্বোধন। দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি এই সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্লিপার ট্রেন যাত্রীদের জন্য দ্রুত, আরামদায়ক ও আধুনিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দেবে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যাত্রীবান্ধব সুযোগ-সুবিধার জন্য এই ট্রেনকে রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিন পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে প্রধানমন্ত্রী ৭টি অমৃত ভারত ট্রেন পরিষেবারও উদ্বোধনী পতাকা প্রদর্শন করবেন। এর ফলে রাজ্য থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে যাত্রী চলাচল আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা।
উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সড়ক ৩১ডি (NH-31D)-এর ধূপগুড়ি–ফালাকাটা অংশের পুনর্বাসন ও চার লেন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে উল্লেখযোগ্য গতি আসবে এবং ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের সঙ্গে রাজ্য ও দেশের অন্যান্য অংশের সংযোগ আরও মজবুত হবে।
অন্যদিকে হুগলি সফরে প্রধানমন্ত্রী বালাগড়ে এক্সটেন্ডেড পোর্ট গেট সিস্টেম প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এই প্রকল্পের আওতায় গড়ে উঠবে একটি আধুনিক ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট (IWT) টার্মিনাল ও একটি রোড ওভার ব্রিজ (ROB)। প্রায় ৯০০ একর এলাকা জুড়ে বালাগড়কে একটি আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যার বার্ষিক ধারণক্ষমতা ধরা হয়েছে প্রায় ২.৭ মিলিয়ন টন।
এই প্রকল্পে নির্মিত হবে দুটি অত্যাধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং জেটি—একটি কনটেইনার কার্গোর জন্য এবং অন্যটি ড্রাই বাল্ক কার্গো পরিবহণের উদ্দেশ্যে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ভারী পণ্য পরিবহণকে শহরের ব্যস্ত এলাকা থেকে সরিয়ে এনে লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এর ফলে কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে যানজট ও দূষণ কমার পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পাবে।
বালাগড় প্রকল্প শিল্প, MSME এবং কৃষি উৎপাদকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জলপথ ব্যবহারের ফলে কম খরচে এবং কম সময়ে পণ্য পরিবহণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে লজিস্টিকস, টার্মিনাল অপারেশন, পরিবহণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষেত্র মিলিয়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জলপথ পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে প্রধানমন্ত্রী কলকাতায় অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক ক্যাটামারান পরিষেবার সূচনা করবেন। কোচিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড নির্মিত দেশীয় ৬টি ইলেকট্রিক ক্যাটামারানের মধ্যে এটি একটি। ৫০ জন যাত্রী বহনক্ষম এই হাইব্রিড ইলেকট্রিক অ্যালুমিনিয়াম ক্যাটামারানটি সম্পূর্ণ জিরো-এমিশন ইলেকট্রিক মোডে চলতে সক্ষম, পাশাপাশি প্রয়োজনে হাইব্রিড মোডেও ব্যবহার করা যাবে। হুগলি নদী ধরে নগর নদী-পরিবহণ, ইকো-ট্যুরিজম ও শেষ মাইল সংযোগ উন্নত করতে এই পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
রেল পরিকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন জয়রামবাটি–বড়গোপীনাথপুর–ময়নাপুর নতুন রেললাইন, যা তারকেশ্বর–বিষ্ণুপুর রেললাইন প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি ময়নাপুর থেকে জয়রামবাটি পর্যন্ত নতুন ট্রেন পরিষেবাও চালু হবে, যা বড়গোপীনাথপুরে যাত্রাবিরতি করবে। এর ফলে বাঁকুড়া জেলার বাসিন্দা, ছাত্রছাত্রী, কর্মজীবী মানুষ ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত আরও সহজ হবে।
সব মিলিয়ে রেল, সড়ক ও জলপথে এই বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ পরিকাঠামো আরও মজবুত হবে। একই সঙ্গে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের সংযোগ জোরদার হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।














