এষণা কুন্ডু , পলিটিক্যাল ডেস্ক ; মালদা জেলায় ২০১৭ সালের বন্যা ত্রাণ বণ্টনে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানাল রাজ্য বিজেপি। বিজেপি কার্যালয়ে এক সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র অ্যাডভোকেট দেবজিত সরকার মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে দাখিল হওয়া সিএজি রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনেন। দুটি জনস্বার্থ মামলার—WPA(P) 316 of 2021 এবং WPA 375 of 2022—প্রেক্ষিতে এই রিপোর্ট তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
দেবজিত সরকারের দাবি, ২০১৭ সালে ফুলহার, মহানন্দা ও কালিন্দী নদীর জলস্তর বিপদসীমার উপরে উঠে মালদার হরিশচন্দ্রপুর ১ ও ২, রতুয়া ১ ও ২ এবং চাঁচল ব্লক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই সময় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যখন চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও প্রশাসনের একাংশ মিলিতভাবে বন্যা ত্রাণের টাকা লুট করেছে।
সিএজি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বিজেপি মুখপাত্র জানান, ৬,৯৬৫ জন ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২ থেকে শুরু করে ৪২ বার পর্যন্ত ত্রাণের টাকা জমা হয়েছে। বিশেষ করে হরিশচন্দ্রপুর–২ ব্লকে এক তৃণমূল ক্যাডারের অ্যাকাউন্ট থেকেই ৪২ বার টাকা তোলার তথ্য উঠে এসেছে। জেলা শাসকের রিপোর্টে যেখানে বলা হয়েছে যে কোনও পাকা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেখানে ভুয়ো ক্ষয়ক্ষতির নামে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ।
ওল্ড মালদা ব্লকেও অনিয়মের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন দেবজিত সরকার। তাঁর দাবি, সেখানে প্রায় ১.১১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যেখানে ১,৯০৪ জন তথাকথিত সুবিধাভোগীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয়েছে, অফিস স্থানান্তরের সময় গুরুত্বপূর্ণ ‘সি ফর্ম’ নথি হারিয়ে গেছে। কিন্তু এই বিষয়ে কোনও থানায় ডায়েরি বা পুলিশি অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলেই সিএজি নিশ্চিত করেছে।
বিজেপির অভিযোগ অনুযায়ী, মোট ১০৮ জন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা ও আধিকারিক বেআইনিভাবে বিপিএল তালিকাভুক্ত থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকার বেশি ত্রাণের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি তালিকার বাইরে থাকা ৬,৬০৫ জন ব্যক্তিকে অতিরিক্ত ৭.৩ শতাংশ হারে পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। আরও বিস্ফোরক তথ্য হিসেবে উঠে এসেছে, সরকারি তালিকাভুক্ত ৮৩,৮৭৪ জনের মধ্যে প্রায় ২৫,১১০ জনের কোনও ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরিদর্শনই করা হয়নি, অথচ তাঁদের নামেও ত্রাণের টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় অনুদান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলেন রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র। তিনি জানান, কেন্দ্রের তরফে পাঠানো বিপুল অর্থের ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট এখনও জমা দেয়নি রাজ্য সরকার। পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তরের প্রায় ৮১,৮৩৯ কোটি টাকা এবং স্কুল শিক্ষা দপ্তরের প্রায় ৩৬,৮৫০ কোটি টাকার ইউসি বকেয়া রয়েছে বলে সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও সংবিধানের ২০৪ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে বিধানসভার অনুমোদন ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।
দেবজিত সরকার আরও বলেন, “এই ত্রাণ চুরি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমফান, বুলবুলের মতো একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও একই কায়দায় সরকারি ত্রাণ তহবিল লুট করা হয়েছে।” তাঁর দাবি, সিএজি তদন্ত শুরু হওয়ার পরেই কিছু ক্ষেত্রে ভুয়ো আবেদনপত্র দেখিয়ে টাকা ফেরতের নাটক করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে দুর্নীতি কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
বক্তব্যের শেষে বিজেপি মুখপাত্র বলেন, “এই সিএজি রিপোর্ট তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত স্বচ্ছতা ও বাঙালি অস্মিতার দাবির মুখোশ খুলে দিয়েছে।” যাদের প্রাপ্য ছিল সেই সাধারণ বাঙালির টাকা লুট করে রাজ্যকে আর্থিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাঙালির শেষ গণতান্ত্রিক লড়াই, আর সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।














