বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন: কলকাতা প্রেসক্লাবে আর্তনাদ নির্যাতিতদের

এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্যাতন, হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার.....

Hindu persecution in Bangladesh: Victims' cries of anguish at the Kolkata Press Club.
Hindu persecution in Bangladesh: Victims' cries of anguish at the Kolkata Press Club.


এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্যাতন, হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার কলকাতা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ময়দান টেন্টে অনুষ্ঠিত এই সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া  হিন্দুরা   তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সম্মেলনের আয়োজন করে সনাতনী সংসদ; সহযোগিতায় ছিল লেখক-শিল্পী সমন্বয় সমিতি।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সনাতনী সংসদের সভাপতি গোবিন্দ দাস, বাংলাদেশে নির্যাতিত বাপ্পাদিত্ত বসু, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন ভারতীয় নৌসেনা সদস্য বিমল কুমার চন্দ্র, বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পান্ডা-সহ বিভিন্ন সমাজকর্মী ও বিশিষ্টজনেরা। এছাড়াও বহু নির্যাতিত মানুষ ছিলেন, যাঁরা নিরাপত্তাজনিত কারণে ক্যামেরার সামনে আসতে পারেননি।

সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই সনাতনী সংসদের সভাপতি গোবিন্দ দাস বলেন, “দেশভাগের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় মদতে জঙ্গি ও জিহাদি শক্তি বাংলাদেশকে হিন্দুশূন্য করার পরিকল্পনা করছে—এই আশঙ্কা আজ আর কল্পনা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা।”

বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ বহুগুণে বেড়েছে। মন্দির ভাঙচুর, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, প্রাণনাশের হুমকি এবং সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার মতো ঘটনার শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু হিন্দুরা। এই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দু প্রতিনিধি বাপ্পাদিত্ত বসু আবেগঘন কণ্ঠে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, “আমি জানি না আজকে এই কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশে কোনো হিন্দু পাড়া পুড়িয়ে দেওয়া হবে কিনা, স্বাধীনতার প্রতীকগুলোর উপর আঘাত আসবে কিনা। তবুও আমাদের কথা বলা দরকার।” তিনি জানান, তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গে আরও একজনকে আনসারউল্লা জঙ্গি গোষ্ঠীর তরফে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

বাপ্পাদিত্ত বসু আরও বলেন, “গত ১৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে আমি সূর্যের আলো পর্যন্ত দেখতে পারিনি। আমার বাড়িতে হামলা হয়েছে, আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। গোপনে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। মানসিকভাবে আমি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। আমার চোখের দৃষ্টিশক্তিও প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম।” তিনি দাবি করেন, তাঁর মতো অবস্থায় বাংলাদেশে অসংখ্য হিন্দু পরিবার দিন কাটাচ্ছেন।

তিনি জানান, ভারতীয় হাই কমিশনের সহযোগিতায় তিনি একটি মেডিকেল ভিসা নিয়ে ভারতে আসতে সক্ষম হন। তবে তাঁর আবেদন, “যতদিন না বাংলাদেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে এবং হিন্দুরা নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস করতে পারছে, ততদিন আমাদের ভারতে নিরাপদে থাকার অনুমতি দেওয়া হোক। আমরা আমাদের দেশে ফিরতে চাই, কিন্তু শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক জীবন ছাড়া ফেরা সম্ভব নয়।”

নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। বাপ্পাদিত্ত বসু বলেন, “নতুন সরকার আসার পর জেএনপি-র এক শীর্ষ নেতা মুক্তি হারুনি জাহাদের মতো কুখ্যাত জঙ্গিনেতাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। একাধিক মাদ্রাসা থেকে জেহাদি জঙ্গিদের গ্রেফতার করা হলেও সরকার দাবি করছে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই—সবই নাকি মিডিয়ার সৃষ্টি।” তাঁর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলি জেএনপি ও হরকত-উল-জেহাদের নেতাদের দ্বারা পরিচালিত সেলের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এই জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই-এর স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে।

সম্মেলনে উপস্থিত প্রাক্তন নৌসেনা কর্মকর্তা বিমল কুমার চন্দ্র বলেন, “আমি একজন যুদ্ধসেনা হিসেবে জানি স্বাধীনতার মূল্য কী। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে আমরা যে লড়াই করেছি, তা ছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে। আজ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”

বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পান্ডা বলেন, “এটি শুধু একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়, এটি মানবতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা জরুরি। ভারত সরকারকে কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হবে।”

সনাতনী সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই সংগঠনটি শুরু থেকেই ভিন্ন চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করে আসছে। রাম মন্দির আন্দোলনে ৫০০ বছর ধরে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের সম্মান জানানো থেকে শুরু করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমি-ক্লাসিক্যাল সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন—সব ক্ষেত্রেই তারা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সচেতনতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সাংবাদিক সম্মেলনের শেষ পর্বে নির্যাতিতদের পক্ষ থেকে একযোগে আবেদন জানানো হয়—বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্ত হোক, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং ততদিন পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।

এই সম্মেলন ফের একবার সামনে আনল বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের করুণ বাস্তবতা—যেখানে বেঁচে থাকার লড়াই প্রতিদিনের সঙ্গী, আর নিরাপত্তা আজও অধরা।

Thank You for Reading – Political Daily

Thank you for taking the time to read our news at Political Daily.
We appreciate your trust in our platform as your source for reliable and timely Indian news.Your support encourages us to continue delivering accurate, unbiased, and impactful stories that matter to you.

Stay informed. Stay connected.
– Political Daily