এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক ; কলকাতা সফরে বিশ্বখ্যাত ফুটবলার লিওনেল মেসিকে এক নজর দেখার উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিল আপামর ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে। মাসের পর মাস টাকা জমিয়ে, পূজোর খরচ বাঁচিয়ে কিংবা কষ্টার্জিত পারিশ্রমিক আলাদা করে রেখে বহু মানুষ টিকিট কেনার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসির সরাসরি দেখা না মেলায় হতাশা গ্রাস করে হাজার হাজার ভক্তকে। দামি টিকিট কেটেও অনেকেই প্রিয় ফুটবলারকে সামনে থেকে দেখতে পাননি, এমনকি গাড়িতে করে এক ঝলক দেখার আশাও অধরাই থেকে যায়।এই হতাশার আবহেই এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে নজর কেড়েছেন নদিয়ার রানাঘাট রামনগরের বাসিন্দা শিল্পী মানিক দেবনাথ। মেসিকে সামনে থেকে দেখতে না পাওয়ার কষ্ট তিনি রূপ দিয়েছেন শিল্পে। অবাক করা বিষয়, একটি ক্ষুদ্র ছোলার ডালের ওপর অতি সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়ে তিনি এঁকেছেন বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি।
মানিক দেবনাথ নিজেও ছিলেন মেসির একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনিও চেয়েছিলেন প্রিয় ফুটবলারকে সামনে থেকে দেখতে। কিন্তু সেই সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর মনেও জমে উঠেছিল গভীর কষ্ট। তবে সেই কষ্টকে হতাশায় ডুবিয়ে না রেখে, তিনি বেছে নেন সৃষ্টির পথ। নিজের আবেগ, ভালোবাসা আর না-পাওয়ার যন্ত্রনাকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক অবাক করা শিল্পকর্ম—মাত্র একটি ছোট ছোলার ডালের ওপর আঁকা লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি।
খুব কাছ থেকে না দেখলে বোঝাই যায় না, একটি ছোলার ডাল কতটা ক্ষুদ্র। সেই ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যেই অতি সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়ে মেসির মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা নিঃসন্দেহে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয়। প্রায় সাত দিনের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই প্রতিকৃতি। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখে চাপ নিয়ে, একাগ্র মনে কাজ করে গিয়েছেন মানিক দেবনাথ। সামান্য ভুল হলে গোটা শিল্পকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবুও ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছেন।
এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। শিল্পপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ ফুটবল ভক্ত—সকলেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অনেকেই বলছেন, চোখের সামনে মেসিকে দেখতে না পারলেও এই শিল্পকর্মে যেন আবেগের মেসিকেই খুঁজে পাচ্ছেন তাঁরা। ছোট্ট একটি ছোলার ডালের মধ্যে ধরা পড়েছে হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা, স্বপ্ন আর কষ্ট।
মানিক দেবনাথের কাছে এই কাজ নতুন কিছু নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার তাঁর অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। মাইক্রো আর্টে তাঁর দক্ষতা ইতিমধ্যেই পরিচিত। আগে তিনি ছোলার ডালের ওপর সৌরভ গাঙ্গুলি, দিয়েগো ম্যারাডোনা, অমিতাভ বচ্চন এবং লিওনেল মেসির প্রতিকৃতি এঁকেছেন। প্রতিটি কাজেই ফুটে উঠেছে নিখুঁত শিল্পবোধের সঙ্গে অসাধারণ ধৈর্য। সাধারণ রঙ, তুলো আর অতি সূক্ষ্ম তুলি ব্যবহার করেই তিনি এমন শিল্প সৃষ্টি করেন, যা দেখলে বিস্মিত হতে হয়।
নিজের শিল্পকর্মের পেছনের ভাবনা সম্পর্কে মানিক দেবনাথ বলেন,
“মেসিকে সামনে থেকে দেখতে না পারার কষ্টটা খুব গভীর ছিল। মনে হচ্ছিল, এত কাছাকাছি এসেও যেন অনেক দূরে থেকে গেলাম। তখনই ভাবলাম, এই আবেগটাকে আমি আমার শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করব। যারা আমার মতোই মেসিকে দেখতে পারেননি, এই কাজটা তাঁদের জন্য। যেন অন্তত শিল্পের মাধ্যমে হলেও মেসিকে একটু কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।”
তাঁর কথায় স্পষ্ট, এই শিল্পকর্ম শুধু ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং হাজারো হতাশ ভক্তের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। মেসিকে সামনে থেকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা এখানে রঙ আর রেখার মাধ্যমে নতুন ভাষা পেয়েছে।
শিল্পীমহলও মানিক দেবনাথের এই কাজকে উচ্চ প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, এত ক্ষুদ্র মাধ্যমে এত নিখুঁত কাজ করতে গেলে শুধু প্রতিভা নয়, চাই অদম্য মানসিক শক্তি ও একাগ্রতা। তাঁর এই কাজ প্রমাণ করে, শিল্পের জন্য বড় ক্যানভাস বা দামী উপকরণের প্রয়োজন নেই—সৃষ্টিশীল মন থাকলেই সাধারণ একটি ছোলার ডালও হয়ে উঠতে পারে শিল্পের ক্যানভাস।
স্থানীয় বাসিন্দারাও মানিক দেবনাথের এই সাফল্যে গর্বিত। রানাঘাট রামনগরে তাঁর বাড়িতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন কৌতূহলী মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কাছ থেকে কাজটি দেখছেন, আবার কেউ ভবিষ্যতে এমন আরও শিল্পকর্ম দেখার আশাও প্রকাশ করছেন।
মেসিকে দেখা না-পাওয়ার হতাশা যেখানে বহু মানুষের মনে ক্ষতের মতো দাগ কেটেছে, সেখানে মানিক দেবনাথ সেই কষ্টকে রূপ দিয়েছেন সৃষ্টিতে। তাঁর এই শিল্পকর্ম মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও থেমে থাকে না, সুযোগ না পেলেও তা নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়। ছোলার ডালের ওপর আঁকা মেসির প্রতিকৃতি আজ শুধু একটি শিল্প নয়, বরং আবেগ, ভালোবাসা ও সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য দলিল













