এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক ; নদিয়ার হাঁসখালীর চাঞ্চল্যকর নাবালিকা গণধর্ষণ ও মৃত্যুর মামলায় অবশেষে বিচারিক স্বীকৃতি মিলল। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর আট মাসের আইনি লড়াই শেষে রানাঘাটের বিশেষ পকসো আদালত এই মামলার ন’জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। সোমবার বিচারক সৌমেন গুপ্তর এজলাসে মামলার রায় ঘোষণা হয়। আজ আদালত অভিযুক্তদের সাজা ঘোষণা করবে।
এদিন সকালেই কড়া পুলিশি পাহারায় ন’জন অভিযুক্তকে রানাঘাট আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রায়ে বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য, ফরেনসিক রিপোর্ট ও তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া নথির ভিত্তিতেই অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল। অভিযোগ অনুযায়ী, নদিয়ার হাঁসখালী থানার অন্তর্গত একটি গ্রামে ব্রজ গয়ালির বাড়িতে জন্মদিনের পার্টির নাম করে চোদ্দো বছরের এক নাবালিকা কিশোরীকে ডেকে আনা হয়। সেখানে তাকে জোর করে মদ খাওয়ানো হয় এবং পরপর ন’জন অভিযুক্ত তাকে গণধর্ষণ করে বলে অভিযোগ।
ভয়াবহ নির্যাতনের ফলে কিশোরীর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিবারের দাবি, ওই রাতেই সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। পরদিন ভোরে বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। এখানেই থেমে থাকেনি ঘটনার নৃশংসতা। অভিযোগ, মৃত্যুর পর কোনও চিকিৎসকের শংসাপত্র বা ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি গ্রামের এক অনথিভুক্ত শ্মশানে দেহ দাহ করা হয়।
চাপ ও অভিযোগ
মৃত কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং শাসক দলের একাংশের চাপেই দেহ দাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর প্রথমে পরিবার ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি। ঘটনার চার দিন পর কিশোরীর মা হাঁসখালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতেও শুরু হয় তীব্র তরজা। বিরোধী দলগুলি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অভিযুক্তদের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ ওঠে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রাথমিক তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে উত্তাল হয় রাজ্য।
তদন্তে সিবিআই
প্রথমে রাজ্য পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও তদন্তের গতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে ২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল মামলার তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সিবিআই তদন্তে নেমে দ্রুত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। মাত্র ৮৫ দিনের মধ্যে তারা ২০৯ পৃষ্ঠার বিশাল চার্জশিট জমা দেয়। চার্জশিটে গণধর্ষণ, পকসো আইন, প্রমাণ লোপাট এবং অপরাধে ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর ধারাগুলি যুক্ত করা হয়।
তদন্ত চলাকালীন একাধিক সাক্ষীর বয়ান, ডিজিটাল প্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। আদালতে সাক্ষ্য দেন মৃত কিশোরীর পরিবারের সদস্যরাও।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় একাধিক তারিখে শুনানি হয়। সাক্ষীদের জেরা, সরকারি কৌঁসুলির যুক্তি এবং অভিযুক্তদের আইনজীবীদের পাল্টা সওয়াল—সব মিলিয়ে মামলা চলে দীর্ঘ প্রায় চার বছর। শেষ পর্যন্ত বিচারক সৌমেন গুপ্ত সোমবার মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি অপরাধ নয়, সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নৃশংস উদাহরণ। নাবালিকার উপর সংঘটিত এই পাশবিকতার বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি প্রয়োজন বলে আদালত অভিমত প্রকাশ করে।
আজ সাজা ঘোষণা
আজ অভিযুক্তদের সাজা ঘোষণা করবে রানাঘাটের বিশেষ পকসো আদালত। আদালত সূত্রে খবর, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যে ধারাগুলি প্রমাণিত হয়েছে, তাতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শাস্তির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
হাঁসখালীর এই ঘটনা এখনও রাজ্যের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে আছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আদালতের রায়ে ন্যায়বিচারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রান্ত হলো বলেই মনে করছেন অনেকেই। এখন সকলের নজর আজকের সাজা ঘোষণার দিকে।
















