এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক ; দমদম কিশোর ভারতী হাই স্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক), কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তাদের বার্ষিক পরম্পরা বজায় রেখে এ বছরও আয়োজন করল প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ শিবির ২০২৬। গত ৯ই মার্চ থেকে ১২ই মার্চ পর্যন্ত এই শিবির অনুষ্ঠিত হয় আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের অন্তর্গত মনোরম জয়ন্তী গ্রামে। পাহাড়, নদী ও ঘন অরণ্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থানটি ‘ডুয়ার্সের রানী’ নামে পরিচিত।
এই শিবিরে স্কুলের ৬৫ জন ছাত্র, প্রধান শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং তিনজন প্রাক্তনী মিলিয়ে মোট ৮০ জন অংশগ্রহণ করেন। প্রকৃতির কোলে কয়েকদিন কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা যেমন পরিবেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তেমনই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণও তুলে ধরেছে।
শিবিরের প্রথম দিনেই শুরু হয় চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিং কার্যক্রম। সান্তালাবাড়ি থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লেপচাখা গ্রাম পর্যন্ত ছাত্র-শিক্ষকরা ট্রেক করেন। ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন এই পাহাড়ি গ্রাম পৌঁছতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির কঠোরতা ও সৌন্দর্য—দুয়েরই স্বাদ পায়। ফেরার পথে তারা ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্ট পরিদর্শন করে, যা স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত।
দ্বিতীয় দিনে, একজন অভিজ্ঞ গাইডের নেতৃত্বে জয়ন্তী নদীর শুষ্ক পাথুরে বেড ধরে ছোট মহাকাল ও বড় মহাকাল ট্রেকিং করা হয়। ছোট মহাকাল তুলনামূলক সহজ হলেও বড় মহাকাল ট্রেক ছিল বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য। এই ট্রেকের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা পরিবেশ রক্ষার বার্তা তুলে ধরে ‘গ্রীন ট্রেল’-এ অংশ নেয়। নদীর পাড় ও পথজুড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে তারা পরিবেশ সচেতনতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পরে পরিবেশ দপ্তরের গাড়ি এসে সেই বর্জ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
তৃতীয় দিন সকালবেলা ছাত্ররা বার্ড ওয়াচিং-এ অংশগ্রহণ করে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ‘সেলফ-কুকিং’-এর মাধ্যমে নিজেদের রান্না নিজেরাই করে, যা তাদের আত্মনির্ভরতা ও দলগত কাজের মানসিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এই দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রামের মানুষের জন্য আয়োজিত একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই শিবিরে নেতৃত্ব দেন স্কুলের প্রাক্তনী ডাঃ আদিত্য চৌধুরী (MBBS, MD)। তাঁর তত্ত্বাবধানে গ্রামের বহু মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা ও প্রাথমিক ওষুধ পেয়ে উপকৃত হন। এই উদ্যোগে গ্রামবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং তাদের অনুরোধে শিবিরের চতুর্থ দিনেও পুনরায় মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়।
‘গ্রীন ট্রেল’ এবং মেডিক্যাল ক্যাম্প—এই দুই উদ্যোগ জয়ন্তীর বাসিন্দাদের মনে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় মানুষেরা ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী পিন্টু সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, “এই ধরনের শিবিরের মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র প্রকৃতি দর্শন নয়, বরং ছাত্রদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা। ভবিষ্যতে যদি তারা এই শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলেই এই শিবিরের প্রকৃত সার্থকতা।”
প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষা ও মানবিকতার এই অনন্য সংমিশ্রণ দমদম কিশোর ভারতী হাই স্কুলের এই উদ্যোগকে নিঃসন্দেহে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে|














