থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত উত্তেজনার বলি হেরিটেজ প্রিহ ভিয়ার মন্দির

এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক ;কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক সংঘর্ষের আবহে সীমান্ত এলাকায়.....

The Preah Vihear temple, a heritage site, falls victim to the Thailand-Cambodia border tensions.
The Preah Vihear temple, a heritage site, falls victim to the Thailand-Cambodia border tensions.

এষণা কুন্ডু , নিউজ ডেস্ক ;কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক সংঘর্ষের আবহে সীমান্ত এলাকায় হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর একটি মূর্তি ভাঙার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত| কম্বোডিয়াতে মন্দির ভাঙার সাম্প্রতিক ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে চলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট প্রিহ ভিয়ার (Preah Vihear) মন্দির কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী এলাকায় একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারী যন্ত্রপাতি—বিশেষ করে JCB মেশিন—ব্যবহার করে মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এই ঘটনায় ভারত তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।

প্রিহ ভিয়ার মন্দির কমপ্লেক্সটি প্রায় ১১০০ বছরের পুরনো একটি হিন্দু মন্দির, যা খেমার স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। কম্বোডিয়ার উত্তরাঞ্চলে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরটি বহুদিন ধরেই থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকলেও, মন্দির সংলগ্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে আসতেই বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ভারত সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রিহ ভিয়ার কেবল কম্বোডিয়ার নয়, সমগ্র মানব সভ্যতার ঐতিহ্য। এই ধরনের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শনের ক্ষতি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। ভারতের তরফে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের চিহ্নিত করা এবং মন্দির ও মূর্তিগুলির পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বুধবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে ‘অসম্মানজনক কাজ’ হিসেবে অভিহিত করে জানায়, এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিষ্ণুভক্তদের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

ভারতের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়াকে সংযম দেখিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। কম্বোডিয়ার অভিযোগ, থাইল্যান্ডের দিক থেকেই মূর্তিটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, কম্বোডিয়ার প্রিয়া বিহার প্রদেশের মুখপাত্র লিম চানপানহা বলেন, ২০১৪ সালে নির্মিত ওই বিষ্ণুমূর্তিটি থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে কম্বোডিয়ার আন সেস এলাকায় অবস্থিত ছিল। গত সোমবার ব্যাকহো লোডার দিয়ে মূর্তিটি ভেঙে ফেলা হয়। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

লিম চানপানহা এই ঘটনাকে নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করে বলেন, “বৌদ্ধ ও হিন্দু অনুসারীদের কাছে পূজনীয় প্রাচীন মন্দির ও মূর্তি ধ্বংস করা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “বিরোধপূর্ণ থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত একটি হিন্দু ধর্মীয় মূর্তি ভেঙে ফেলার খবর আমরা দেখেছি। হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবতারা এই অঞ্চলের বহু মানুষের কাছে পূজনীয়। এটি একটি ভাগ করা সভ্যতার ঐতিহ্য।”

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে এবং প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি রোধে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা জরুরি। শান্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ভারত আবারও উভয় পক্ষকে সংলাপ ও কূটনীতির পথে এগোনোর আহ্বান জানাচ্ছে।

এদিকে, থাইল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এখনো মূর্তি ভাঙার অভিযোগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। পাঁচ দিনের সংঘর্ষের পর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে চলতি মাসে ফের সংঘাত শুরু হয়। নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত ৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোয় যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর করার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দফা আলোচনা আগামী সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা। তার মধ্যেই বুধবার দুই দেশের মধ্যে নতুন করে লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে।

সীমান্তবর্তী সিসাকেত ও সুরিন প্রদেশে সংঘর্ষ হয়েছে। থাই গণমাধ্যমে বলা হয়, কাম্বোডিয়ার রকেট হামলার জবাবে থাই বাহিনী ট্যাংকের গোলা ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রিহ ভিয়ার মন্দির অতীতেও সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে খমের রুজ শাসনামলে কম্বোডিয়ার বহু ঐতিহাসিক মন্দির ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সময়ে খমের রুজ বাহিনী প্রিহ ভিয়ার মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যার ফলে মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা শুধু সংঘর্ষের ফলেই সীমাবদ্ধ নয়। অতীতেও কম্বোডিয়ায় অবহেলা, দুর্বল নির্মাণ পরিকল্পনা ও প্রাকৃতিক কারণে মন্দির সংক্রান্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে সিম রিপে একটি নির্মাণাধীন বৌদ্ধ মন্দির ধসে পড়ে শ্রমিক ও সন্ন্যাসীদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন ফেলেছিল। সেই ঘটনাও ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছিল।

কম্বোডিয়ার আরেকটি বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য হলো আংকোর ওয়াট (Angkor Wat)। দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় স্থাপনাগুলির মধ্যে অন্যতম এবং হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অনুপম উদাহরণ। আংকোর ওয়াটসহ কম্বোডিয়ার বহু প্রাচীন মন্দির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে ভারত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক দল ও বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে কম্বোডিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সংরক্ষণ প্রকল্পে কাজ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিহ ভিয়ার মন্দিরের আশপাশে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। সীমান্ত সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে যেন প্রাচীন স্থাপত্য ধ্বংস না হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের কড়া অবস্থান কেবল কূটনৈতিক বার্তাই নয়, বরং বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন দেখার, সংশ্লিষ্ট দেশগুলি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই অভিযোগের তদন্ত ও ঐতিহাসিক মন্দিরগুলির সুরক্ষায় কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Thank You for Reading – Political Daily

Thank you for taking the time to read our news at Political Daily.
We appreciate your trust in our platform as your source for reliable and timely Indian news.Your support encourages us to continue delivering accurate, unbiased, and impactful stories that matter to you.

Stay informed. Stay connected.
– Political Daily